অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য রেড সার্কেল - শার্লক হোমসের সেরা গল্প

।। অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য রেড সার্কেল।।


এক বাড়িউলি, মিসেস ওয়ারেন, অদ্ভুত এক মামলা নিয়ে এসে হাজির হলেন একদিন। ভাড়া দেবার পর দিন থেকে দশ দিন ধরে ভাড়াটের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। দরজা বন্ধ করে সকাল সন্ধ্যা লোকটা নাকি ঘরে পায়চারি করছে-বাইরে বেরুচ্ছে না।

এক বাক্যে হোমস নাকচ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভদ্রমহিলার অসহায় অধীর অবস্থা বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ না শুনে পারল না। বন্ধুবর যত কাঠখোট্টা নিরস স্বভাবের হোক না কেন, কারুর কষ্ট দেখলে সইতে পারে না, বরাবর তাই দেখেছি। এখন চেয়ারে সোজা হয়ে বসে ভদ্রমহিলাকে আশ্বস্ত করে বলল, ঘটনাটা কি হয়েছে গোড়া থেকে খুলে বলুন।

মিস ওয়ারেন বললেন, দিন দশেক আগে ওপর তলায় একটা বসবার ঘর আর একটা শোবার ঘর নিয়ে থাকতে চাইলেন ভদ্রলোক। থাকা খাওয়া বাবদ খরচ সপ্তাহে পঞ্চাশ শিলিং। কিন্তু ভদ্রলোক বললেন-বাড়ির চাবি তার কাছে রাখতে হবে এই শর্তে তিনি সপ্তাহে পাঁচ পাউন্ড দিতে রাজি আছেন। অনেক ভাড়াটেই কারোকে বিরক্ত করতে চায় না বলে চাবি নিজের কাছে রাখতে চায়। আমিও আর আপত্তি করিনি, বাড়তি কিছু টাকাও এখন হাতে আসবে। একটা পনের পাউন্ডের নোট আগাম ধরিয়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক। কিন্তু কি বলব মিঃ হোমস, সেই প্রথম রাতে লোকটা একবার মাত্র বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিল। বলে গিয়েছিল ফিরতে রাত হবে তাই সদর খোলা রেখেছিলাম। শব্দ শুনে বুঝতে পেরেছিলাম মাঝ রাতে ফিরে এসেছে। তারপর থেকে সেই যে দরজা বন্ধ করেছে আর খুলবার নাম নেই। অবস্থা দেখে আমার কর্তার মনের অবস্থা খুবই কাহিল হয়ে পড়েছে। কোথায় কি কাণ্ড করে এসে লোকটা এভাবে ঘরে লুকিয়ে বসে আছে বুঝে উঠতে পারছি না। ঘণ্টা বাজালে খাবার দরজার সামনে চেয়ারে রেখে আসছি। আবার ঘণ্টা বাজালে বাসন নিয়ে আসা হয়। বিশেষ কিছু দরকার হলে বড় হাতের অক্ষরে কাগজে লিখে জানিয়ে দেয়।

বলতে বলতে ভদ্রমহিলা কয়েকটা টুকরো কাগজ বার করে দেখালেন। কাগজগুলোর কোনটায় লেখা SOAP, কোনটায় MATCH, প্রথম দিনে নাকি দিয়েছিল DAILY GAZETTE লেখা কাগজটা। সেই থেকে প্রত্যেকদিন সকালে কাগজটা পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে।
ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত ঠেকল আমাদের কাছে। হোমস নড়েচড়ে বসল। বুঝতে পারছিলাম প্রয়োজনের কথা বড় হাতের অক্ষরে লেখবার উদ্দেশ্য হতে পারে একটাই, হাতের লেখা গোপন করতে চায়। খুবই হুঁশিয়ার লোক বলতে হবে।

এরপর হোমসের টুকরো টুকরো প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, লোকটা নিজের নামধাম কিছু বলে নি। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। মুখ ভর্তি দাড়ি, জামাকাপড়ে পরিপাটি চেহারা। কথা বলে ভাল, ইংরেজীও বলে ভাল, তবে বোঝা যায় বিদেশী মানুষ। দেখা সাক্ষাৎ করতে কেউ আসে না, চিঠি চাপাটিও না। ঘরদুয়ার গোছগাছ নিজের হাতেই করে, ঝি কে পাঠাবার দরকার হয় না। আনবার মধ্যে সঙ্গে এনেছে মাত্র একটা ব্যাগ-বাদামী রঙের মস্ত বড় ব্যাগ।

শুনতে শুনতে হোমস ক্রমশই কৌতূহলী হয়ে উঠছিল। ক্রমশই ঝুঁকে পড়ছে ভুরু জোড়া। আবার জিজ্ঞেস করল, ঘর থেকে কিছু পাওয়া যায়নি? মিসেস ওয়ারেন একটা খাম থেকে বার করলেন দুটো পোড়া দেশলাই কাঠি আর একটা পোড়া সিগারেটের টুকরো। বললেন, শুনেছি ছোটখাট জিনিস

থেকে আপনি অনেক ব্যাপার ধরতে পারেন, তাই নিয়ে এসেছি-আজ সকালে

ট্রেতে পাওয়া গেছে।

টুকরোগুলো পরীক্ষা করতে করতে সহসা যেন সজাগ হয়ে উঠল হোমস। সিগারেটের শেষ পর্যন্ত টানা হয়েছে। কিন্তু একজন দাড়িওয়ালা লোকের পক্ষে দাড়ি না পুড়িয়ে ওভাবে সিগারেট টানা সম্ভব নয়। সিগারেটের পেছনে থুথুর চিহ্নও পাওয়া গেল। হোল্ডারে খাওয়া হয় নি যে তার প্রমাণ। ঘরে লোকও রয়েছে একজনই। মিসেস ওয়ারেন জোর দিয়েই বললেন।

-এখনো পর্যন্ত দুশ্চিন্তা করবার মত কোন কারণ ঘটেনি, নতুন কোন ঘটনা ঘটলে জানাবেন। এই বলে সেদিনের মতো বাড়িউলী ভদ্রমহিলাকে বিদায় করল হোমস।

ঘটনাটায় হোমসের আগ্রহ নজরে পড়েছিল। তাই তাকালাম ওর দিকে। পাইপ টানতে টানতে আমাকে বলল, কেসটা খুব সাধারণ বলে মনে হচ্ছে না ওয়াটসন। আমার ধারণা ঘরে লোক বদল হয়েছে। যে ভাড়া নিয়েছিল সে নেই ঘরে।

আমার কৌতূহল লক্ষ্য করে এরপর একে একে বুঝিয়ে দিল ওর ধারণার কারণগুলো। প্রথমতঃ ঘর ভাড়া নিয়েই লোকটা বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিল গভীর রাতে-কেউ তাকে দেখেনি। তারপর থেকেই দরজা বন্ধ। লোক বদল না হলে এরকম ঘটনার কোন ব্যাখ্যা হয় না। দ্বিতীয়তঃ ভাড়াটে ইংরেজী বলে ভাল, কিন্তু যে লোক প্রয়োজনের কথা টুকরো কাগজে লিখে দিচ্ছে সে ইংরাজীতে কাঁচা। MATCHES না লিখে সেকারণেই MATCH লিখেছে। ভাষার দখলের অভাবেই কাটছাঁট শব্দ মাত্র ব্যবহার করছে। হোমসের যুক্তি অকাট্য। বললাম-কিন্তু ব্যাপারটায় উদ্দেশ্য তো বুঝতে

পারা যাচ্ছে না।

-সেটাই খুঁটিয়ে দেখতে হবে ভায়া। সবুর কর। বলতে বলতে তাক থেকে একটা মোটা খাতা নামিয়ে আনল হোমস। বিভিন্ন কাগজ থেকে হারানো প্রাপ্তি-নিরুদ্দেশের খবর কেটে প্রতিদিন যত্ন করে সেঁটে রাখে এই খাতায়।

কি খুঁজতে খুঁজতে এক জায়গায় এসে থমকে থামল। বলল-ওয়াটসন, পেয়েছি, মনে হচ্ছে এটাই হবে-শোন-প্রথমে বেরেয়িছিল: যোগাযোগের উপায় হচ্ছে-ধৈর্য ধরো। এইখানে চোখ রেখ-জি। মিসেস ওয়ারেনের বাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসার দুদিন পরেই বেরিয়েছে বিজ্ঞাপনটা। একটা ব্যাপার পরিষ্কার হল-DAILY GAZETTE-এর বিজ্ঞাপন এটা-লোকটা ইংরেজী ভাল লিখতে না পারলেও পড়ে বুঝতে পারে বোঝা যাচ্ছে। দেখ, তিনদিন পরেই অবার বেরিয়েছে: কাজের ব্যবস্থা হচ্ছে-শিগগিরই মেঘ কেটে যাবে। -ডি। এরপর দেখছি শেষ বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছে সাতদিন পরে, গতকাল। এটা অনেক স্পষ্টঃ বাধা দূর হচ্ছে-সুযোগটা পেলে সংকেত খবর নিশানা-একটা-A, দুটো-B। শিগগিরই পাবে। -জি। যা দেখছি ওয়াটসন, আরও দু একটা বিজ্ঞাপনের জন্য সবুর করতে হবে।

পরদিন সকালের কাগজেই পাওয়া গেল মোক্ষম বিজ্ঞাপনটা। উল্লসিত হয়ে হোমস পড়ে শোনাল: সামনের দিকটা সাদা পাথর, উঁচু লাল বাড়ি। চারতলায় দ্বিতীয় জানলা ছেড়ে-সন্ধ্যের পর। জি। ভায়া, মিসেস ওয়ারেনের ভাড়াটের সঙ্গে একটু দেখা সাক্ষাতের দরকার যে এবারে।

হোমসের কথা শেষ হতে না হতেই ঝড়ের মত এসে ঘরে ঢুকলেন মিসেস ওয়ারেন। অদ্ভুত এক নতুন ঘটনার সংবাদ নিয়ে এসেছেন ভদ্রমহিলা। সকালে সাতটা নাগাদ মিঃ ওয়ারেন কাজে বেরিয়েছিলেন:- রাস্তায় পা দিতে না দিতেই আচমকা দুটোলোক মাথায় কোট চাপা দিয়ে ধরাধরি করে একটা গাড়িতে তুলে নেয়। ঘণ্টা খানেক পরে হ্যামারস্টেড হীদের ফুটপাতে ফেলে দেয়। ভদ্রলোক কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে এসে এলিয়ে পড়েছেন। মিসেস ওয়ারেন-এর ধারণা এ ব্যাপারে তার রহস্যময় নতুন ভাড়াটে জড়িত। তাই পুলিশের কাছে যাবার আগে হোমসের পরামর্শ নিতে ছুটে এসেছেন।

হোমস বলল, মিসেস ওয়ারেন, যা বুঝতে পারছি বিপদটা ঘটবার কথা ছিল আপনার ভাড়াটের। সকালের কুয়াশায় ভুল করে আপনার স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। অধীর হবেন না, আপনার ভাড়াটের শ্রীমুখ একপলক যাতে দেখতে পারি সে ব্যবস্থা করুন।

মিসেস ওয়ারেন খানিক ভেবে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে, আপনারা দুপুরে চলে আসুন।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কাছেই গ্রেট ওরসে স্ট্রীট। মিসেস ওয়ারেনের বাড়িটা বেশ উঁচু-হলদে রং-এর। বেলা বারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম সেখানে। কোণের দিকে হোয়ে স্ট্রীটের আবাসিক ফ্ল্যাট বাড়িগুলো দেখতে দেখতে আচমকা একটা বাড়ির দিকে উল্লসিতভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করল হোমস। বেশ উঁচু লাল বাড়ি। সামনেটা পাথর দিয়ে তৈরি। বিজ্ঞাপনের সংকেত বার্তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। একটা জানালায় ঘর ভাড়ার নোটিশ ঝুলছে। হোমস বলল, ওখানেই ঘাঁটি নিয়েছে-নজর রাখতে হবে।

মিসেস ওয়ারেন সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন। নতুন ভাড়াটের ঘরের দরজার উল্টোদিকে একটা মাচা-ঘরে এমন ভাবে আয়না বসিয়ে দিয়েছেন, খাবার ট্রে নেবার জন্য লোকটা বাইরে বেরুলে ঘরে বসেই আমরা তাঁর চাঁদমুখ দর্শন করতে পারব।

মাচা ঘরের অন্ধকারে আমাদের বসিয়ে দিয়ে মিসেস ওয়ারেন চলে যাবার খানিক পরেই শুনতে পেলাম ঘণ্টা বাজিয়ে খাবার তলব পড়ল। মিসেস ওয়ারেন দরজার সামনে ট্রে নামিয়ে রেখে চলে গেলেন। একটু পরেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে সমান্য ফাঁক হল দরজা-সামনের আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিবিম্বে স্পষ্ট চোখে পড়ছে সব। একজোড়া সরু হাত বেরিয়ে এসে ঝট করে তুলে নিয়ে গেল ট্রেটা-পরক্ষণেই খালি ট্রে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে গেল। চকিতের জন্য নজরে পড়ল-একটা সুন্দর ভয়ার্ত মুখ দরজার ফাঁক দিয়ে মাচাঘরের সামান্য ফাঁক করা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। পর মুহূর্তেই ঝট করে বন্ধ হযে গেল দরজা। যে উদ্দেশ্যে আসা তা ব্যর্থ হল না আমাদের।

মিসেস ওয়ারেনকে রাত্রিতে আসবার কথা জানিয়ে আমরা বেকার স্ট্রীটে ফিরে এলাম। হোমস বলল, ঘরের ভাড়াটে বদল হয়েছে বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু একজন মহিলা যে ঘরে ঢুকে বসে আছেন আঁচ করতে পারিনি ভায়া। বললাম, সামনের দরজায় ফাঁক দেখে মনে হয় কিছু সন্দেহ করেছেন।

-মনে হয়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে তো-ভয়ংকর কোন বিপদ মাথায় নিয়ে লন্ডনে পালিয়ে এসেছেন একটি দম্পতি। স্বামীটি কাজে বাইরে রয়েছেন-আর স্ত্রীকে ভাড়া করা ঘরে এমনিভাবে লুকিয়ে রেখেছেন। পেছনে শত্রু তাই দেখাসাক্ষাৎ সম্ভব হচ্ছে না। সরাসরি চিঠি লিখতে পারছে না। সে কারণেই খবরের কাগজে হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ কলমে বিজ্ঞাপন দিয়ে খবর পাঠাচ্ছে স্বামীটি। মহিলা হাতের লেখা গোপন করবার জন্যই কাগজের টুকরোয় বড় হাতের অক্ষর বসিয়ে বাড়িউলীকে চাহিদার কথা জানাচ্ছে।

ওয়াটসন, স্বামীটির খুন হয়ে যাবার ভয় রয়েছে শত্রুরা খুন করবার উদ্দেশ্যেই ভুল করে মিঃ ওয়ারেনের ওপর হামলা করেছিল। ওরাও এখনো বুঝতে পারেনি ঘরে লোক বদল হয়েছে। ভায়া, কেসটা ইন্টারেস্টিং, দক্ষিণার ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করছি না-অনেক কিছু শেখা যাবে লেগে থাকলে।

সন্ধ্যা নাগাদ দুই বন্ধু হাজির হলাম মিসেস ওয়ারনের বাড়িতে। অন্ধকার বসবার ঘরে গিয়ে আসন নিলাম। সামনেই অনেক উঁচুতে ওপর তলার ফ্ল্যাট বাড়ির জানালা চোখে পড়ল-টিম টিম করে জ্বলছে একটা আলো। শার্সিতে মুখ চেপে রয়েছে হোমস। ওই অবস্থায় এক সময় বলে উঠল-ওয়াটসন, একজন পুরুষ মানুষের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। হাতে মোমবাতি নিয়ে এক বাড়ির ওপর তলায় ভদ্রমহিলাকে লক্ষ্য করবার চেষ্টা করছে। নজরে পড়েছে নিশানা শুরু করেছে। ওয়াটসন-তুমি লিখে নাও বলে যাচ্ছি-একবার আলো দেখানো হলো—মানে-A।

মোমবাতির ফ্ল্যাশ গুণে গুণে শেষ পর্যন্ত যে কটা অক্ষর পেলাম তাতে দাঁড়াল A-TTENTA। খানিক বিরতি দিয়ে পরপর তিনবার একই শব্দ ফ্ল্যাশ হল। আলো সরে যেতে হোমস সোজা হয়ে বসল।

বললাম-ATTENTA-মানে তো কিছু বোঝা গেল না। হোমস্ হেসে বলল-খুবই জটিল সংকেত সন্দেহ নেই। শব্দটি ইটালিয়ান-স্ত্রীলোককে উদ্দেশ্য করে, তাই আগে বসেছেন A-অর্থটা সাবধান। সাবধান। সাবধান। ভদ্রমহিলাকে হুঁশিয়ার করা হল-ভায়া-খুবই ঘোরালো ব্যাপার মনে হচ্ছে।

একটু পরেই আবার জানালায় আলো দেখা গেল। দ্রুত শিখা নেড়ে জানানো

হল-পেরিকোলা। পেরিকোলা। হোমস একভাবে তাকিয়ে থেকে বলে যাচ্ছে। আচমকা আলোটা নিভে গেল। হোমস চমকে উঠে জানালা থেকে ছিটকে সরে এল।

-ওয়াটসন, বিপদ, বিপদ, কিন্তু মাঝ পথে সংকেত বন্ধ হয়ে গেল কেন?

ভয়ংকর কিছু ঘটেছে মনে হচ্ছে। চল শিগগির-স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে। ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম দুজনে। ঘাড় ঘুরিয়ে মিসেস ওয়ারেনের বাড়ির ওপর তাকালাম। সামনের বাড়ির দিকে তাকিয়ে কাঠ হয়ে বসে থাকা একটি মেয়ের মুখ নজরে পড়ল। দ্রুত পা চালিয়ে চলেছি আমরা। হোয়ে স্ট্রীটের সংকেত পাঠানো ফ্ল্যাট বাড়িটির দরজার সামনে আসতেই আচমকা রেলিং-এর ধার থেকে সরে এসে গ্রেটকোট পরা একটি মূর্তি সামনে এসে দাঁড়াল।

-মিঃ হোমস যে, এদিকে কি মনে করে?
-আরে গ্রেগসন তুমি-জানালায় আলোর সংকেত দেখে এগুচ্ছিলাম।

চমকে উঠল গ্রেগসন। ওপর তলার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আপনাকে যখন পেয়ে গেছি-আর পালাতে পারবে না বাছাধান। বলতে বলতে প্রবল উত্তেজনায় এগিয়ে গিয়ে ফুটপাতের পাথরে সজোরে ছুরি ঠুকল গ্রেগসন। সঙ্গে সঙ্গে একটা চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি থেকে চাবুক

হাতে গাড়োয়ান নেমে এল।

আমেরিকার পিনকারটন এজেন্সীর ছদ্মবেশী রহস্যসন্ধানী মিঃ লেভারটনের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিল গ্রেগসন।

লঙ আয়ল্যান্ড গুহা-রহস্যের নায়কের নাম অজানা ছিল না। অভিনন্দন জানাল হোমস। তরুণ আমেরিকান লেভারটনের কাছ থেকে এক অবিশ্বাস্য বার্তা পাওয়া গেল তখন। পঞ্চাশটা খুনের নায়ক, রেড সার্কল গোরজিয়ানোর পেছু নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে হাজির হয়েছে সাতদিন ধরে খুঁজে খুঁজে আজ গ্রেগসনকে নিয়ে ওঁৎ পেতেছে বাড়ির সামনে-এ বাড়িতেই নাকি ঢুকেছে শয়তানটা।

লেভারটন বলল-বাড়িতে যাতায়াতের পথ একটাই। এবারে বাছাধন পার পাবে না। তিনটে লোক খানিক আগে বেরিয়ে গেছে-কিন্তু তাদের মধ্যে গোরজিয়ানো ছিল না।

হোমসের কাছে আলোক সংকেতের বিবরণ পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠল

লেভারটন। -নিশ্চয় দলের লোকদের সংকেত পাঠাচ্ছিল। আমাদের দেখতে পেয়ে সাবধান হয়ে গেছে। একটা কিছু করা দরকার।

হোমসের পরামর্শমত তখুনি বাড়ির ভেতরে হানা দেওয়া ঠিক হল। দল বেঁধে ছুটে তিন তলায় উঠে গেলাম। বাঁ হাতের ফ্ল্যাটের দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ঘর। ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেখা গেল-কার্পেটহীন মেঝেয় রক্তের ধারা। রক্ত মাখা পদচিহ্ন অনুসরণ করে ভেতরের একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। এক বীভৎস দৃশ্য অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। শূন্য ঘরের মাঝখানে হাঁটু মুড়ে দুহাত সামনে ছড়িয়ে পড়ে আছে অতিকায় এক মূর্তি। দাড়ি গোঁফ কামান পুরুষমূর্তি। গলায় আমূল বসানো একটা ছোরা। কেবল বাঁটটুকুর সামান্য অংশ বাইরে চোখে পড়ছে। ঘরে রক্তের বন্যা। মেঝেয় হাতের কাছে পড়ে আছে একটা কালো দস্তানা আর একটা মোষের শিংয়ের বাঁটওলা দু দিক ধারালো বিকট ছোরা।

-ওরে বাপস। এ যে স্বয়ং ব্ল‍্যাক গোরজিয়ানো। আমাদের আগেই কেউ শেষ করে দিয়ে গেছে-

হোমস ততক্ষণে জানালায় মোমবাতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। বাতিটা খানিক এদিকওদিক নেড়ে শেষে 'ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। -ও আবার কি করলেন মিঃ হোমস? সবিস্ময়ে বলে উঠল গ্রেগসন।

-সবুর কর। কিন্তু তিনটে লোক বলছিলে না বেরিয়ে গেছে-এদের মধ্যে দাড়িওয়ালা কেউ ছিল?

-ছিল। বলে উঠল আমেরিকান ডিটেকটিভ। -মাঝারি আকারের কালচে মুখ-বয়স তিরিশের কোঠায়-

-সেই তো সবার শেষে আমার পাশ দিয়ে গেল। -খুনটা সেই করেছে-মেঝেতে পায়ের ছাপটা দেখে নিন, আর দেখতে কেমন তো বললাম-

-অসম্ভব মিঃ হোমস-অমন চেহারায় মানুষ লন্ডনের রাস্তায় লক্ষ লক্ষ ঘুরছে- -ঘাবড়াবেন না-সবই জানতে পারবেন-সংকেত পাঠিয়েছি, এই যে

এসে গেছেন।-

চমকে উঠে সকলে পিছনে তাকিয়ে দেখি দীর্ঘাঙ্গী এক সুন্দরী দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। বুঝতে কষ্ট হল না-মিসেস ওয়ারেনের সেই ভাড়াটে। বিস্ফারিত দুই চোখে অপরিসীম ভয়-মৃতদেহের দিকে চোখ রেখে বিহ্বলভাবে এগিয়ে এলেন। মুখে অস্ফুট বিলাপ ধ্বনি-বিড়বিড় করে বলছেন-ডিওমিও...ডিওমিও... স্তম্ভিত হয়ে আছি সকলে। সহসা কি হল বুঝতে পারলাম না। দুহাত মাথার

ওপরে তুলে উল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন। দুর্বোধ্য ইটালিয়ান শব্দের ফোয়ারা ছুটিয়ে ঘরময় উন্মত্ত নৃত্য জুড়ে দিলেন। আচমকা নাচ থামিয়ে আমাদের দিকে ঘুরে বলে উঠলেন-আপনারা? পুলিশই তো মনে হচ্ছে-গুইসিপ্পি গোরজিয়ানোকে আপনারাই খতম করেছেন? কিন্তু-জেনারো-আমার স্বামী জেনারো লুক্কা কোথায়? খানিক আগে আমাকে জানালা থেকে ডেকে পাঠালো।

-ম্যাডাম, আমিই ডেকেছি আপনাকে, বলল হোমস, আপনাদের সংকেত আমি ধরে ফেলেছি-আপনাকে দরকার বলেই VIENI শব্দ ফ্ল্যাশ করেছিলাম মোমবাতি দিয়ে।

ভয় বিস্ময় আনন্দ মিশিয়ে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে বলে উঠলেন সুন্দরী-জেনারো লুক্কা আর আমি এমিলি লুক্কা এই কালো শয়তানের ভয়ে নিউইয়র্ক থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। বুঝতে পারছি-নিজের হাতে পিশাচটাকে শেষ করেছে ওই-আমার স্বামী-আমার স্বামী-এতদিন ধরে যে আমাকে দু-হাত দিয়ে আগলে রেখেছে-গর্বে উল্লাসে আবেগে কেঁপে উঠল সুন্দরীর কণ্ঠস্বর।

ভাবাবেগ স্পর্শ করল না কাঠখোট্টা গ্রেগসনকে। নীরস কণ্ঠে বলে উঠল-মাপ করবেন, কিছুই বুঝতে পারছি না, কিন্তু এক্ষুনি যা বললেন, তাতে মনে হচ্ছে-আপনার এখন থানায় যাওয়া দরকার।

-সবুর কর গ্রেগসন। বাধা দিল হোমস, ম্যাডাম, বুঝতেই পারছেন খুনের অপরাধে আপনার স্বামী গ্রেপ্তার হবে, কিন্তু যদি মনে করেন, খুনটার পেছনে তার কোন দুষ্ট উদ্দেশ্য ছিল না তাহলে যা জানেন খুলে বলুন, তাতে তার ভাল হবে।

-শয়তান গোরজিয়ানোকে খুন করার জন্য পৃথিবীর কোন আদালতেই আমার স্বামীর সাজা হবে না। শয়তান খতম হয়েছে-আর আমাদের ভয় নেই।

পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। হোমসের পরামর্শ সকলে মিলে চলে এলাম এমিলি লুক্কার ঘরে। লাশ রেখে আসা হল তালাবন্ধ ঘরে। মিঃ সেস লুক্কার জবানবন্দীতে প্রকাশ পেল এক আশ্চর্য কাহিনী। তাঁর জবানীতেই এখানে তুলে দিচ্ছি হুবহু।

-আমার বাবা অগাস্টার বেরিলি নেপলস-এর কাছে পোসলিপ্পেতে ওকালতি করতেন। সেখানেই আমার জন্ম। জেনারো বাবার কাছে চাকরি করত। সামাজিক প্রতিষ্ঠা বা টাকা ছিল না তার। কিন্তু রূপবান জেনারোর অফুরন্ত প্রাণ শক্তি আমাকে আকর্ষণ করেছিল। বাবা বিয়েতে রাজি হলেন না। দুজনে তখন পালিয়ে গেলাম। আমেরিকায়। সঙ্গের গয়নাগাটি বিক্রি করে চার বছর আগে প্যারিতে বিয়েটা সেরে নিয়েছিলাম। সুখে সংসার করছি। কপাল গুণে সুখের দিনের নাগাল পেয়ে গেলাম। ঘটনাচক্রে একদিন ক্যাসতালোত্তি অ্যান্ড জামবিয়া কোম্পানির একজন প্রভাবশালী অংশীদার ক্যাসতালোত্তিকে একদল মারমুখী গুণ্ডার হাত থেকে উদ্ধার করেন আমার স্বামী। ক্যাসতালোত্তি ইতালিয়ান মানুষ-বিয়ে থা করেননি। কোম্পানির সর্বময় কর্মকর্তা তিনিই। উপকারের কথা মনে রেখে নিজের কোম্পানিতে স্বামীকে চাকরি দিলেন। পরে ব্রুকলিনে নিজের বাড়িতে নিয়ে তুলেছিলেন। ছেলের মত দেখতেন ওঁকে। দিনে দিনে বুঝতে পারলাম-সব সম্পত্তি একদিন আমাদেরই লিখে দেবেন তিনি।

একদিন জেনারো বাড়ি ফিরল দানবের মত দেখতে একটা লোককে সঙ্গে নিয়ে। নাম গোরজিয়ানো। লোকটার হাত পা গলার স্বর সবই ভয়ংকর। আপনারাও তো দেখেছেন। অমন নচ্ছার বজ্জাত মানুষ জীবনে দেখিনি। কিন্তু কথার মধ্যে যেন যাদু ছিল লোকটার। চুম্বকের মত আটকে রাখত কথা বলে। ঘন ঘন আসতে লাগল এর পর থেকে। জেনারো নিজেও তাকে পছন্দ করত না। তবুও নানান বিষয়ে গল্পে মেতে থাকতে বাধ্য হত।

কেন জানি না আমার মনে হত-লোকটাকে ভীষণ ভয় পায় জেনারো। একদিন চেপে ধরে জানতে চাইলাম কি ব্যাপার। ওর কথা শুনে হাত পা গুটিয়ে যাবার মত হল আমার। জীবনের একটা চরম দুঃসময়ের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিউপলিটন সোসাইটিতে নাম লিখিয়েছিল জেনারো। এ হল খুনে সংগঠন কুখ্যাত রেড সার্কল। যে একবার নাম লেখায় জীবনে আর বেরিয়ে আসতে পারে না। আমেরিকায় পালিয়ে এসে জেনারো এদের কব্জা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। ইটালিয়ান পুলিশের ভয়ে রক্ত-পিশাচ গোরজিয়ানোও আমেরিকায় এসে সমিতির একটা-শাখা খুলে বসেছিল, রাস্তায় একদিন দেখা হয়ে যেতে জেনারোর সঙ্গ ধরে এসেছিল আমাদের বাড়িতে। আমেরিকায় নতুন করে রক্তারক্তি কাণ্ডে সরাসরি পেতে চাইল জোনারোকে। কেবল তাই নয়-ততদিনে তার দৃষ্টি পড়েছে আমার দিকে। আমি তার হায়নার মত লোলুপ চোখ দেখে তা বুঝতে পারতাম। একদিন জেনারো কাজ থেকে ফেরার আগেই বাড়ি এসে হাজির হল গোরজিয়ানো। আমাকে তার সঙ্গে পালিয়ে যাবার জন্য জবরদস্তি আরম্ভ করল।

এই সময় জেনারো ফিরে এল। সব শুনে রাগে উন্মত্ত হয়ে মারতে মারতে ঘর থেকে বার করে দিল শয়তানটাকে। সেই থেকে বাড়ি আসা বন্ধ হল তার।

এই ঘটনার কদিন পরেই রেড-সার্কল সমিতির সদস্যদের সভায় স্থির হল-আমাদের পরম হিতৈষী ক্যাসতালোত্তির বাড়ি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে।

আর কাজটার দায়িত্ব পড়ল জেনারোর ওপর। ষড়যন্ত্র করেই ব্যাপারটা করেছিল গোরজিয়ানো। রেড সার্কেল অর্থবান ইটালিয়ানদের দোহন করেই সমিতির তহবিল বাড়াতে। ক্যাসতালোত্তিও ছিল তাদের প্রথম শিকার। টাকা চেয়ে বিমুখ হয়ে সমিতি স্থানীয় ইটালিয়ানদের মনে ভয় ধরাবার উদ্দেশ্যে স্থির করল ক্যাসতালোত্তিকে উচিত শিক্ষা দেবে। কপট লটারিতে জেনারোর নাম তুলে আনল গোরজিয়ানো। এটা তার পুরনো কায়দা। কাউকে চিরদিনের মত সরিয়ে দেওয়ার মতলব যখন করে তখন কোন প্রিয়জনকে মারবার ভার দেয়। ব্যর্থ হলে দলের লোক লেলিয়ে খতম করে তাকে। জেনারো সবই বুঝতে পারল। কিন্তু সে চায় বাঁচতে। যেদিন ডিনামাইট দিয়ে ক্যাসতালোত্তির বাড়ি উড়িয়ে দেবার কথা, সেদিন দুপুরেই গোপনে লন্ডনে রওনা হলাম দুজনে। আসবার আগে ক্যাসতালোত্তিকে সব জানিয়ে দেওয়া হল-ভবিষ্যতে যাতে তার কোন ক্ষতি না হয় সেভাবে পুলিশকেও খবর দেওয়া হল।
গোরজিয়ানোর তাড়া খেয়ে শেষমেস এখানে এসেও আমাদের লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। ইটালি আর আমেরিকায় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য জেনারোকে বাইরে থাকতে হয়েছে। আমাকে কিভাবে দিন কাটাতে হচ্ছিল সে তো সবই জানেন আপনারা। আমি জানি না, আমার স্বামী এখন কোথায় আছে। খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন মারফত কেবল তার খবর পেতাম। ভেবেছিলাম গোরজিয়ানো এ বাড়ির সন্ধান পাবে না। কিন্তু একদিন দুজন ইটালিয়ানকে রাস্তা থেকে এ বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুঝতে পারি তার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি আমার স্বামী। এর পরেই জেনারো খবর দিল সামনের বাড়ির ঐ জানালা থেকে সংকেত জানাবে। সংকেত পেলাম আজ বিপদের-সতর্ক থাকবার। সংকেত মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেতে ভয় হল গোরজিয়ানো নাগাল ধরে ফেলেছে। কিন্তু দেখছি-শত্রুর মোকাবিলার জন্য সে প্রস্তুত হয়েই ছিল। পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়ে চলে গেছে। এবারে আপনারাই বলুন-এই খুনের অপরাধে শাস্তি হওয়া উচিত কিনা আমার স্বামীর।

আমেরিকান ডিটেকটিভ গ্রেগসনকে বলল, আপনাদের ব্রিটিশ আইন কি বলবে জানি না, সমাজের শত্রু নিধনের জন্য মিঃ জেনারো আমাদের দেশে অভিনন্দিত হতেন।

গ্রেগসন বলল, কথার সত্যতা প্রমাণ হলে কারোরই কোন ভয়ের ব্যাপার

নেই। তবে নিয়ম অনুযায়ী একে একবার থানায় যেতে হবে। আচ্ছা মিঃ হোমস-বুঝতে পারছি না আপনি এ ব্যপারে জড়িয়ে পড়লেন কি করে? হোমস চেয়ার ছেড়ে উঠে বলল, শিক্ষার শেষ নেই গ্রেগসন-নতুন কিছু শেখার উদ্দেশ্যে নেমেছিলাম, পথে তোমাদের সঙ্গে মোলাকাত হয়ে গেল। এবারে ওঠা যাক। চল ওয়াটসন।

- অনুবাদ
পৃথ্বীরাজ সেন

Post a Comment

0 Comments